IMG_20211013_224306

রেডলাইট এলাকা, সহজ বাংলায় যৌনপল্লি, শাস্ত্রমতে যাদের প্রবেশদ্বারের মাটি ছাড়া দুর্গাপুজো হয়না — তারা নিজেরাই যদি দুু্র্গাপূজো করতে চায়! কেমন হয় তবে? না খুব সহজে যে হয়না বলাই বাহুল্য। কারণ প্রগতির ভাষণ যতই দেওয়া হোক, সমাজের এক বড় অংশের চোখে এখনও তাদের ‘পতিতা’ বলেই মনে করা হয়। তবে এবার তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ভারতের শুধু নয়, এশিয়ার সবচেয়ে বড় যৌনপল্লি ‘সোনাগাছি’তে এবারকার দুর্গাপুজোর মহাষ্টমী রাতে এক অনন্য আয়োজন হতে চলেছে। আর তার পরিচালন ভার নিয়েছে যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’।


সোনাগাছি এলাকায় দুর্গাপুজো প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে এক দীর্ঘ লড়াই রয়েছে। এ লড়াই শুরু ২০১৩ তে, যখন প্রথম দুর্গাপুজোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। হাজারো বাধা পেরিয়ে শেষমেশ হাইকোর্টের নির্দেশে পূজোর অনুমতি মিললেও পরের বছর ২০১৪ তে আবার পূজোর অনুমতি পাওয়া নিয়ে ঝঞ্ঝাট তৈরি হয়। ওই বছর বাইরে অর্থাৎ বারোয়ারি ভাবে নয়, ঘরের মধ্যে পূজো করা হয় সোনাগাছিতে। যথারীতি ২০১৫ সালেও আবার বাধা।  শেষপর্যন্ত ২০১৭ সালে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির হস্তক্ষেপে হাইকোর্ট অনুমতি দেন কমিটি অফিসের সামনে দুর্গাপূজো করবার।

সেই থেকে প্রতিবছর সাধারণভাবেই পূজো হয়ে আসছে। তবে এবার একটু আলাদারকম আয়োজন। আজ মহা অষ্টমীর রাতে সোনাগাছিতে সারা রাত ধরে খিচুড়ি এবং পাঁচমিশালি তরকারি রান্না হবে। নবমীর সকালবেলায় সেই রান্না করা খাবারদাবার পৌঁছে দেওয়া হবে –কালিঘাট, হাড়কাটা গলি, টালিগঞ্জ সহ কলকাতার সমস্ত ছোট মাঝারি যৌনপল্লিতে। নবমীর দিন প্রতিটি পল্লির প্রত্যেকে একসাথে সেই খাবার খাবে।

প্রসঙ্গত, ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’ সারা পশ্চিমবঙ্গের ৬৫ হাজার যৌনকর্মীদের নিয়ে সংগঠিত দল। ১৯৯২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সোনাগাছিতেই এই দলের প্রতিষ্ঠা করা হয়। সারা ভারত জুড়ে নারীদের অধিকার, নারীর স্বাস্থ্যরক্ষা, যৌনকর্মীদের অধিকার ও মানব পাচার প্রতিরোধী কর্মসূচি এবং এইচআইভি -এডস প্রতিরোধ সংক্রান্ত প্রচারের কাজ করে থাকে এই সংগঠন। তাদেরই সক্রিয় পরিচালনায় হচ্ছে সোনাগাছির দুর্গাপূজো।


তবে এবার সোনাগাছির যৌনকর্মীরা একটি ব্যাপারে মুখ ফিরিয়েছে। তারা পণ করেছে শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী যে প্রবেশদ্বারের মাটি দুর্গাপূজোর জন্য দেওয়া হয় তা আর দেবেনা তারা। এতদিন সমাজ ‘পতিতা’ বলে মুখ ফিরিয়েছে। এটা তারই নিরুচ্চার প্রতিবাদ। বদলে নিজেদের দুর্গাপূজোকেই নতুন আয়োজনে তারা ভরিয়ে তুলতে চায়। কারুর বদান্যতা না নিয়ে স্বনির্ভরতার সাথে এবারের থিমপূজোর আয়োজন করেছে তারা।

চোরবাগান দুর্গোৎসব  থেকে দুর্গাপ্রতিমা এসেছে ১০১ টাকা বিনিময়ের অনুদানে।  পুজোর  থিম ‘আমাদের লড়াই সকলের উৎসব, নবম বর্ষে দুর্বারের দুর্গোৎসব ‘।
‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’-র পক্ষ থেকে মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “মুখে যতই বলা হোক উৎসব সকলের, তা সত্ত্বেওএই পেশায় যারা রয়েছে তাদের সাথে উৎসবের যোগ থাকেনা বললেই চলে। সকলেই ভোগ পেতে ভালোবাসে। তাই কারা কী দেবে তার পরোয়া না করেই আমরা এই কর্মসূচি নিয়েছি”।

মহাশ্বেতা আরও জানান এই মূহুর্তে কলকাতায় প্রায় ৮০০০ সংখ্যক যৌনকর্মী রয়েছেন। সমস্ত অঞ্চলে গাড়িতে করে নবমীর সকালে ভোগ পৌঁছে যাবে। নবমীতে একসাথে সবাই খিচুড়ি ভোগ খাবেন।

By Partha Roy Chowdhury (কিঞ্জল রায়চৌধুরী)

Partha Roy Chowdhury (Bengali: কিঞ্জল রায়চৌধুরী) is staff journalist VoiceBharat News. email: kinjol@voicebharat.com