IMG_20220524_025212

আজ ২৪ মে , ‘বাংলা’-র বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের ১২৩ তম জন্মবার্ষিকী পূর্ণ হল। এখানে দুর্ভাগ্যক্রমে ‘কোট আনকোট’ করে ‘বাংলা’ শব্দটিকে ব্যবহার করতে হচ্ছে। কেননা বাংলা তো আর অখন্ড নয়। আমরা বৃহত্তর ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার কবি হিসেবেই তাঁকে মর্যাদা দিতে প্রয়াস করছি। যদিও বাস্তব চিত্র কিছুটা অন্যরকম।

সেই চিত্রে স্পষ্টত কাজী নজরুল ইসলামের দুটি ছবি প্রকাশ পাচ্ছে। একদিকে কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গে নিছকই মাল্যদান বা পাঠ্য পুস্তকে জায়গা পেয়ে, অথবা দুএকটি গান গেয়ে নেহাতই দায়সারা কর্তব্য পালিত হচ্ছে। তিনি যে অবিভক্ত বাংলার সম্পদ, সেটা কি তবে পশ্চিমবঙ্গবাসী ভুলে গেলেন? কেন হলো এমন! একটু খতিয়ে দেখলে মন্দ কি?


তালতলা লেনে বসে যে কবি ভোররাতে আচমকা জেগে উঠে দীর্ঘ কবিতা ‘বিদ্রোহী’ লিখে সারা বাংলার ইংরেজ শাসকের ঘুম কেড়ে নিলেন, সিআইটি রোড সংলগ্ন পানবাগান লেনে বসে ২০ টি নতুন রাগ এবং  বাংলা গজলের জন্ম দিয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও আধুনিক বাংলা গানের এক নতুন ঘরানার জন্ম দিলেন, সেই  নজরুল ইসলামের বসবাস করা বেশিরভাগ বাসস্থানকে সংরক্ষণ তো দূরে থাক, অধিকাংশ বাড়িতে একটা স্মৃতিফলক পর্যন্ত নেই! যে দুএকটি বাড়িতে রয়েছে সেগুলিও কতদিন থাকবে বলা কঠিন। এখানে আমরা নজরুল ইসলামের একটি বাসস্থানের সম্পর্কে জানবো, যেখানে প্রমীলা দেবীর সাথে কবির বিয়ে হয়েছিল। আক্ষরিক অর্থেই ‘দুটি কুসুম’ যেখানে পাপড়ি মেলে ধরে বলেছিল ‘এখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/গাহি সাম্যের গান।’

ঠিকানা ৬ নম্বর হাজী লেন, কলকাতা-৭০০০১৪। এই বাড়িটিতেই নজরুল ও প্রমীলা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সেদিন হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার কারণে কলকাতার এলিট সম্প্রদায় কার্যত দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।  হোসায়ন সাহেব, ফজলুল হক, চিত্তরঞ্জন দাশ যেমন সপক্ষে দাঁড়িয়ে এই বিবাহ দিয়েছিলেন; তেমনই ভীষণ রুষ্ট হয়েছিলেন নজরুলের বেশকিছু হিন্দু-মুসলিম আত্মীয় বন্ধুগণ। এই বিয়ে তাঁর জীবিকাতেও প্রভাব ফেলেছিল।

‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ব্রাহ্মদল প্রকাশ্যে এই বিয়ের বিরোধিতা করে, ফলে সেই সময়কার বিখ্যাত পত্রিকা ‘প্রবাসী’-তে লেখক হিসেবে নিষিদ্ধ হন কাজী নজরুল ইসলাম। এমনকি সজনীকান্ত দাসের ‘শনিবারের চিঠি’-র সঙ্গে যুক্ত অনেক ব্যক্তিই এই বিয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কবির জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং এতবড় ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, বাড়িটিতে নজরুলের নামাঙ্কিত একটা স্মৃতিফলক পর্যন্ত নেই!

এন্টালি মার্কেটের পিছনদিকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ। তারপরেই  একটি বাইলেন। সেদিকেই চলে গিয়েছে বিদ্রোহী কবি এবং প্রমীলাদেবীর ঠিকানা। এই প্রতিবেদনকারীর সাথে কথা হয়েছিল বাড়িটির নিচতলার যে ঘরটিতে নজরুল থাকতেন সেই ঘরের বর্তমান বাসিন্দা মহম্মদ মেহবুব আলমের সাথে। মেহবুব আলম জানান, তিনি এখানো এসেছিলেন খুব ছোট বয়সে ১৯৮৫ সালে। কিন্তু তিনি কি চেনেন কাজী নজরুল ইসলামকে?উত্তর দিলেন খুব সাবলীল ভাবেই।  বললেন, “হ্যাঁ চিনি তো! তিনি কবি ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। এই তো এই ঘরেই থাকতেন উনি। এখানেই উনার বিয়ে হয়েছিল…”


এরপর এই প্রতিবেদনকারীকে প্রশ্ন শুনতে হয়, “আপনিও কি বাংলাদেশ থেকে আসছেন?”
এই প্রশ্নটাই কি পশ্চিমবঙ্গের নজরুল চর্চার দিকে কটাক্ষে ইঙ্গিত করার জন্য যথেষ্ট নয়? আজও বাংলাদেশ থেকে বা অন্য কোনও স্কলার নজরুল সম্পর্কে খোঁজ করতে এলে মেহবুব আলমের সাথে দেখাসাক্ষাৎ করে তথ্য নিয়ে যান।
প্রত্যেকের কাছেই দরজা হাট করে খুলে দেন মেহবুব আলম। বলেন,  “হ্যাঁ,  এই ঘরেই তো কবি নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়েছিল!”

আমাদের তাহলে হৃদয়ের দরজা খুলতে এত বাধা কোথায়? আজকের দিনেও কি প্রশ্ন করবোনা, কেন নজরুল-প্রমীলার স্মৃতিধন্য বাড়িটিতে একটা ফলক পর্যন্ত বসানো যাচ্ছেনা? প্রশ্ন করবোনা, কেন পদ্মপুকুরের চামড়াহাটের পিছনে বামফ্রন্ট আমল থেকে একটি ‘নজরুল মঞ্চ’ অর্ধসমাপ্ত হয়ে পড়ে রয়েছে যেটার কথা অধিকাংশ মানুষ জানেনই না! ‘বাংলা’ ভাষার কবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে এই প্রশ্নগুলি পশ্চিমবঙ্গবাসীর কাছে তুলে ধরা আজ অত্যন্ত জরুরী বলেই মনে হয়।

By Partha Roy Chowdhury (কিঞ্জল রায়চৌধুরী)

Partha Roy Chowdhury (Bengali: কিঞ্জল রায়চৌধুরী) is staff journalist VoiceBharat News. email: kinjol@voicebharat.com